সাকিব আহসান
প্রতিনিধি,পীরগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও
পীরগঞ্জ উপজেলার হৃদয় জুড়ে সর্পিলাকারে বয়ে গেছে টাঙ্গন নদী একসময় যার নীল জলে প্রতিফলিত হতো গ্রামের শান্ত মুখ, এখন সেই নদী হয়ে উঠেছে ভয় ও অনিশ্চয়তার প্রতীক। প্রতি বর্ষায় টাঙ্গনের পানি বাড়লে তার পাড়ে দেখা দেয় ভাঙন। ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, স্কুল, মসজিদ—সবকিছু হারিয়ে যায় জলের গ্রাসে। অথচ প্রশ্ন জাগে, এই ভাঙন কি শুধুই প্রাকৃতিক? নাকি কেউ এটি “পুষে রাখছে” কোনো বড় প্রকল্পের আশায়?
পীরগঞ্জ উপজেলার একাধিক এলাকার স্থানীয়দের অভিযোগ, নদী ভাঙন এখন একধরনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক হাতিয়ার। যখন নদী ভাঙে, তখন শুরু হয় প্রজেক্ট তোলার আলোচনা।প্রতিরোধ বাঁধ, নদী সংস্কার, স্লুইসগেট, বাঁধন প্রকল্প ইত্যাদি নামে কোটি টাকার কাজ। এই কাজের দরপত্রে নাম আসে সেই পরিচিত কয়েকজন ঠিকাদারের, যাদের সঙ্গে থাকে রাজনৈতিক দলের সমর্থন এবং প্রশাসনের নীরব সহযোগিতা। ফলে নদীর ভাঙন প্রতিবারই “দুর্ভাগ্য নয়, সুযোগ” হয়ে দাঁড়ায় এক শ্রেণির মানুষের কাছে।
টাঙ্গনের বাঁকে বাঁকে দেখা যায় একই চিত্র। বছরের পর বছর ধরে একই জায়গায় ভাঙন, অথচ কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়নি। বরং প্রকল্পের নামে বালু ফেলা, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, এবং বরাদ্দের টাকা ভাগাভাগি হয়ে গেছে কাগজেই। ফলাফল,পরের বছর আবার ভাঙন, আবার নতুন প্রজেক্ট। এ যেন নদীর নয়, বরং প্রজেক্টের পুনর্জন্মচক্র।
নদী ভাঙনের এই কৃত্রিম স্থায়িত্ব গ্রামীণ সমাজের অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামো দুটোই ধ্বংস করছে। মানুষ তাদের বসতভিটা হারিয়ে জলছাড়া বাস্তুচ্যুত হচ্ছে, কিন্তু যাদের দায়িত্ব রক্ষা করার, তারা ব্যস্ত হিসাব মিলাতে। প্রশাসন, রাজনৈতিক প্রভাবশালী এবং ঠিকাদারদের এই গোপন যোগসাজশই নদী ভাঙনকে প্রশ্নাতীত নয়, বরং প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে।
নদী ভাঙন প্রকৃতির একটি বাস্তবতা কিন্তু এর স্থায়িত্ব ও ভয়াবহতা এখন মানবসৃষ্ট। টাঙ্গন নদী আজ এক আয়নার মতো, যেখানে দেখা যায় স্থানীয় দুর্নীতি, প্রজেক্ট রাজনীতি ও প্রশাসনিক উদাসীনতার বিকৃত প্রতিবিম্ব। প্রশ্ন শুধু একটাই,আমরা কি নদী বাঁচাতে চাই, নাকি নদীকে ভাঙতে দিয়ে নিজেদের প্রজেক্ট সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে চাই?



















